রাজবাড়ীতে এবার আসন্ন কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ব্যতিক্রমী নামের তিনটি বিশাল আকৃতির ও ওজনের ষাঁড় গরু- ‘আকাশ ছোঁয়া’, ‘পাহাড় ঠেলা’ ও ‘ফ্যান ভাঙা’। আকার, ওজন ও দৃষ্টিনন্দন সাজে গরু তিনটিকে ঘিরে ইতোমধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল।
অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের এই গরু তিনটি সম্পূর্ণ দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হচ্ছে।আকার-আকৃতি এবং ওজনে বেশি হওয়ায় জেলার সবচেয়ে বড় গরু বলে দাবি গরুর মালিকের।
জানা গেছে, রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের ডাঙ্গিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লোকমান শেখ (৭০) তার পারিবারিক খামারে সাড়ে তিন বছর ধরে আকাশ ছোঁয়া, পাহাড় ঠেলা ও ফ্যান ভাঙা ব্যতিক্রমি নামের এই গরুগুলো দেশীয় ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পরম যত্নে লালন-পালন করছেন। আকাশ ছোঁয়া গরুটি মালিকের থেকেও উঁচা-লম্বা হওয়ায় এবং উচ্চতা ও দৈর্ঘ্য অন্যগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় এ নাম রাখা হয়েছে, এর ওজন ২২ মন। পাহাড় ঠেলা একটু অলস প্রকৃতির হওয়ায় এবং সবকিছু ভেঙে ফেলায় এর নাম রাখা হয় পাহাড় ঠেলা, এর ওজন ২০ মন। আর ফ্যান ভাঙা নামটি এসেছে খামারে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে এর অস্বাভাবিক উচ্চতার কারণে ফ্যান ভেঙে ফেলার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই নামকরণ। ফ্যান ভাঙা গরুটির ওজন ১৫ মন। গরুগুলোর ব্যতিক্রমী নাম নিয়ে এলাকাজুড়ে চলছে মজার আলোচনা।
প্রায় চল্লিশ বছর আগে মাত্র ২৯০০ টাকা দিয়ে একটি বাছুর কিনে লালন-পালন শুরু করেন লোকমান শেখ। সেই বাছুর ১৭ বার বাচ্চা প্রসব করে। ওই একটা বাছুর থেকেই তার খামারে গরুর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মাত্র ২৯০০ টাকা পুঁজি নিয়ে গরু কিনে লালন-পালন শুরু করে খুলে যায় তার ভ্যাগ্যের চাকা। এ পর্যন্ত লোকমান শেখ প্রায় ১ কোটি টাকার গরু বিক্রি করেছেন।
খামারি লোকমান শেখ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার চাচাতো ভাইয়ের গরু পালন দেখে চল্লিশ বছর আগে আমি ২৯০০ টাকা দিয়ে একটা বাছুর কিনি। এই একটা বাছুরই আমার ভ্যাগ্যের চাকাকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমার খামার বড় হতে থাকে। আমি জীবনে অনেক গরু লালনপালন করে বিক্রি করেছি। আমার শখ সবসময় বড় গরু পালন করা। এবারও তিনটি বড় গরু রয়েছে, একটির ওজন ২২ মন, আরেকটি ২০ মন এবং অপরটি ১৫ মন হবে। এই গরু তিনটি আমার বাড়ির ওপর থেকেই বিক্রি করার ইচ্ছা আছে, হাটে তুলবো না।
লোকমান শেখ আরও বলেন, আমি গরুগুলোকে খড়, গমের ছাল, ভুট্টা, কুড়া ও ঘাস খাইয়ে বড় করেছি। কোনো মোটা-তাজাকরণ ওষুধ খাওয়ায়নি। প্রতিটি গরুর পেছনে দিনে ৫০০ টাকা করে খাবার খরচ লাগে আমার। আমার গরু যদি কারোর কেনার ইচ্ছা থাকে তাহলে সরাসরি আমার বাড়িতে এসে দেখেশুনে কিনতে পারবে।
তিনি আরও বলেন, আমি গরু লালন-পালন করছি ৩৫ থেকে ৪০ বছর। আমার জীবনই গরুর পর। আমার আগে কিছুই ছিল না। এই গরু আমাকে আত্মা ভরে দিয়েছে। গরু বিক্রি করে বাড়িওয়ালাকে (স্ত্রী) তিন পাখি জমি কিনে দিয়েছি ও স্ত্রীর নামে ব্যাংকে ১০/২০ লাখ টাকা দিয়ে দিছি। গরু বিক্রি করার টাকা অর্ধেক তার অর্ধেক আমার।
লোকমান শেখের স্ত্রী রাহেলা খাতুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, চল্লিশ বছর ধরে গরু লালন-পালন করছি আমি। এই গরু দিয়েই আমি তিনটা ঘর করেছি, ব্যাংক ব্যালেন্স করেছি। আমি সবসময় বড় গরু পালন করতাম। ঢাকা থেকে ডিপজলের ছেলের এসেও আমার এখান থেকে গরু কিনে নিয়ে গেছে। ২৯০০ টাকা দিয়ে একটা বাছুর কিনেছিলাম আমি। ওই বাছুর বড় হওয়ার পর প্রত্যেক বছর বছর বাচ্চা দিতো। একটা গরু থেকে আমি অনেক গরু বানায়। এবার ঈদে তিনটা গরু বিক্রি করবো, সামনে বছর আরও বিক্রির যোগ্য হবে।
রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জুন বিশ্বাস বলেন, এ বছর রাজবাড়ী জেলায় ৮ হাজার ৮৭২ জন খামারির মাধ্যমে প্রায় ৭০ হাজার গবাদিপশু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ কোরবানির জন্য প্রস্তুত করেছে। আমাদের জেলা প্রাণিসম্পদ ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সারাবছরব্যাপী এ খামারগুলো পরিদর্শন করি এবং খামারিদেরকে প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে গরু লালান-পালন করতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। সেইসঙ্গে কেমিক্যালের ব্যবহার ও বিভিন্ন হরমোনের ওষুধ খাওয়াতে নিরুৎসাহিত করি।
তিনি বলেন, সবসময় বড় গরুর চাহিদা কম থাকে। খামারিরা বড় গরু বাড়ি থেকেই বিক্রি করতে চান। তারা বড় গরু বিভিন্ন আকর্ষণীয় নামকরণ করে লালন-পালন করে থাকে। আমরা চেষ্টা করি তাদেরকে পরামর্শ দেওয়ার, যেন গরুগুলো স্থানীয়ভাবে বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু অসুবিধা হলো বড় গরু চাহিদা স্থানীয়ভাবে খুবই কম। এ কারণে অনলাইনের মাধ্যমে আমরা প্রচারণা চালাই। আবার সাংবাদিকরাও যদি এগুলো প্রচারণা চালিয়ে তাদের এই বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখেন তাহলে তারাও স্বস্তিতে পশুটা বিক্রি করতে পারবে।

