Homeচট্টগ্রামসাইনবোর্ডহীন সেই হোটেল ৫৩ বছর ধরে মানুষ টানছে মিসকিন শাহের স্বাদ

সাইনবোর্ডহীন সেই হোটেল ৫৩ বছর ধরে মানুষ টানছে মিসকিন শাহের স্বাদ

টিনের চালের ছোট্ট ঘর। নেই আধুনিক সাজসজ্জা কিংবা বাহারি কোনো আয়োজন। সাদামাটা টেবিল-চেয়ার দেখে প্রথমে মনে হতে পারে, সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসা কোনো পুরোনো ভাতঘর। অথচ দুপুর গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্য। মাত্র ২০০ বর্গফুটের সেই ভাতঘরের পাঁচটি টেবিলে একসঙ্গে খাবার খান প্রায় ৩০ জন। ভেতরে জায়গা না পেয়ে বাইরে অপেক্ষায় থাকেন আরও অন্তত ২০ জন।

চট্টগ্রাম নগরীর মিসকিন শাহ মাজার গেট সংলগ্ন এই ভাতঘর প্রতিদিনই এমন ব্যস্ততায় মুখর থাকে। কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই আলাদা কোনো নামও। তবে, মাজারের পাশেই অবস্থান হওয়ায় নগরবাসীর কাছে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘মিসকিন শাহ হোটেল’ নামে। ৫৩ বছর ধরে একই স্বাদ ও আস্থার কারণে এখনও এখানে ভোজনরসিকদের ভিড় লেগেই থাকে। বাটা মসলা আর লাকড়ির চুলার রান্না— এই হোটেলের জনপ্রিয়তার প্রধান অনুষঙ্গ।

রোববার দুপুরে এক টেবিলে খাবার খাচ্ছিলেন মাঝবয়সী চারজন। মন্তব্য জানতে চাইলে তাদের মধ্য থেকে মোহাম্মদ ইউনূস নামের একজন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম কলেজে পড়া অবস্থায় এই ভাতঘরের সঙ্গে পরিচয়। প্রায় ৩৫ বছর আগে কলেজ থেকে বেরিয়ে গেলেও মিসকিন শাহ ভাতঘরের স্বাদ থেকে বের হতে পারিনি। তাই যখনই বাইরে খাওয়ার কথা চিন্তা করি, কাজের ফাঁকে বন্ধুদের নিয়ে এখানে চলে আসি। এখানকার মেজবানির মাংসে কোনো হাড় থাকে না।’

‘এটি শুধু একটি ভাতঘর নয়, চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজের ছাত্রদের আবেগের জায়গাও। কারণ, এই দুই কলেজে পড়াশোনা করেছে অথচ এই ভাতঘরে খায়নি, এমন ছাত্র খুঁজে পাওয়া মুশকিল।’

খাবারের অপেক্ষায় থাকা আরেক ভোজনরসিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘মিসকিন শাহ হোটেলের মাংসে চট্টগ্রামের মেজবানির আসল স্বাদ পাওয়া যায়। লাকড়ির চুলায় রান্না হওয়ায় এখানকার খাবারের স্বাদ যেকোনো সাধারণ হোটেলের চেয়ে আলাদা।’

কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই ভালো ডেকোরেশন; এরপরও খাবারের জন্য মানুষের এত ভিড় কেন— জানতে চাইলে ভাতঘরের মালিক মোহাম্মদ মোজাম্মেল করিম বলেন, ‘আমাদের ভাতঘরটি মেজবানি গরুর মাংসের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এই মাংস রান্নায় আমরা পাটায় পিষে তৈরি করা মরিচ-মসলা ব্যবহার করি। আমাদের এখানে মিলিং করা বা প্যাকেটজাত কোনো মসলা ব্যবহার হয় না। বাজার থেকে বাছাই করা আস্ত মসলা কিনে তা পাটায় পিষে রান্নার জন্য তৈরি করা হয়। এছাড়া, গ্যাসের পরিবর্তে লাকড়ি দিয়ে রান্না আমাদের ভাতঘরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।’

ভাতঘরটি শুরুর গল্প জানিয়ে মোজাম্মেল বলেন, “১৯৭২ সালে আমার বাবা হাফেজ আব্দুল হালিম প্রথম এই ভাতঘরটি চালু করেন। ২০০১ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আমরা ভাইয়েরাও চেষ্টা করছি একই স্বাদ ও মান ধরে রাখতে। বাবা মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত এটি স্থানীয়ভাবে ‘হুজুরের ভাতঘর’ নামে পরিচিত ছিল। তবে, এখন ‘মিসকিন শাহ ভাতঘর’ নামেই সবাই চেনে। ভাতঘর চালু হওয়ার আগে আমার বাবা ও দাদা মিলে প্রায় ১৫ বছর এই দোকানে কুলিং কর্নার হিসেবে ব্যবসা করেছিলেন।”

১৯৭২ সাল থেকে ভাতঘরটিতে প্রধান বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতেন রাজা মিয়া। ১৯৯৫ সালে রাজা মিয়ার মৃত্যুর পর থেকে রান্নার দায়িত্বে রয়েছেন তারই শিষ্য আহমদ হোসেন।

বাবুর্চি আহমদ হোসেন বলেন, ‘এই ভাতঘরে আমার কাজের বয়স ৪৪ বছর। ১৯৭৯ থেকে ২০০১ পর্যন্ত রাজা মিয়ার সহকারী ছিলাম, এরপর থেকে রান্নার পুরো দায়িত্ব আমার ওপর। এই হোটেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ঘরোয়া পরিবেশে মেজবানি গরুর মাংস রান্না, যেখানে অতিরিক্ত তেল বা বাজারের খোলা মসলার ব্যবহার নেই। কষ্ট ও খরচ বেশি হলেও রান্নার সব মসলা পাটায় পিষে তৈরি করা হয় এবং রান্না হয় লাকড়ির চুলায়। ৫৩ বছর ধরে একই ফর্মুলায় রান্না হয়ে আসছে।’

 

দীর্ঘদিন ধরে এই ভাতঘরে খেয়ে আসছেন প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রায় ২০-২২ বছর ধরে এই ভাতঘরে খেয়ে আসছি। একই বাবুর্চি দীর্ঘদিন ধরে রান্না করায় এক দিনের জন্যও খাবারের স্বাদ বা মানের পরিবর্তন দেখিনি।’

এই ভাতঘরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কেবল দুপুরের খাবারের জন্য খোলে। এখানে সকাল বা সন্ধ্যার নাস্তার কোনো আইটেম না থাকায় ভাজাপোড়া বা পোড়া তেল ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই, যা মানুষের আস্থার অন্যতম বড় কারণ— জানান তিনি।

মিসকিন শাহ ভাতঘরে দুপুরে কমপক্ষে ২০০ থেকে ২৫০ মানুষ খাবার খায়। এখানকার ইউনিক আইটেম গরুর মাংসের মেজবানি রান্না। এছাড়া মেজবানি চনার ডাল, দেশি মুরগি, ভালো মানের মাছ, সবজি এবং ভর্তা পাওয়া যায়। পাশাপাশি সপ্তাহের তিন দিন (সোম, মঙ্গল ও বুধ) খাসির মাংসও পাওয়া যায়।

ব্যবসা সম্প্রসারণের কোনো চিন্তা আছে কি না— এমন প্রশ্নে মোজাম্মেল বলেন, ‘ঘনিষ্ঠজনরা বিভিন্ন সময়ে শাখা বাড়ানোর পরামর্শ দিলেও আমাদের এমন কোনো চিন্তা নেই। কারণ, কাঁচামাল কেনা থেকে শুরু করে রান্নার প্রক্রিয়া এবং খাবার পরিবেশন পর্যন্ত সব জায়গায় আমরা নিজেরা উপস্থিত থেকে তদারকি করি। শাখা বাড়ালে এই মান ধরে রাখা সম্ভব হবে না। অনেক কাস্টমার আছেন যারা আমার জন্মের আগে থেকেই এই হোটেলে খেয়ে আসছেন। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা কেবল হোটেল মালিক ও কাস্টমারের না, বরং আবেগের।’

প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জানান, ভাতঘরটিতে দিনে গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার বিক্রি হয়, যেখান থেকে কমপক্ষে ১৫ শতাংশ মুনাফা থাকে। হোটেলটিতে বর্তমানে আটজন কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন দুজন বাবুর্চি, দুজন ওয়েটার, একজন ডিশ ক্লিনার এবং একজন মসলা প্রস্তুতকারক।

RELATED ARTICLES

Most Popular

Recent Comments