একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে দেওয়া বক্তব্য কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ দিনভর উত্তেজনা ছিল। হট্টগোলও সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়ালে সংসদের কার্যক্রম কয়েক মিনিট অচল ছিল। এসময় রুলিং দিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তারপরও সরকারি ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা বক্তব্যকালে কেউ কাউকে ছাড় দিতে দেখা যায়নি। সংসদের ২৩তম দিনটি মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধী, জুলাই অভ্যুত্থান, জুলাই সনদ, গণভোট ও অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে দুর্নীতির বিষয়ে আলোচনা-সমালোচনার উত্তেজনা কেটেছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ২৩তম দিনে অধিবেশন কার্যক্রম শুরু হয়। তবে মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
অধিবেশনের শুরুতেই সংসদ সদস্যদের প্রশ্নোত্তর টেবিলে উত্থাপন করা হয়। তারপর বিল উত্থাপন করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির ভাষণের আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সংসদ সদস্যদের বক্তব্য দেওয়া শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বক্তব্যে দেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বক্তব্য দেওয়া শুরু করলেই সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা হট্টগোল করেন।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেছেন, সামান্য কারণে উত্তেজনা সৃষ্টি করা ঠিক নয়, এতে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের সম্মান থাকবে না। পরবর্তীতে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানান। এরপরে সরকারি দল, বিরোধীদল ও বিজেপির সংসদ সদস্য এই প্রসঙ্গে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ। ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে দেখা দেয় উত্তেজনা। বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে সরকারি দলের সদস্যরাও প্রতিবাদ জানান।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা।
তিনি বিরোধীদলের উদ্দেশে বলেন, তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সেইদিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আল বদরের বাচ্চারা, এখনও কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।
ফজলুর রহমান বলেন, অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হয়েছে। সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে? আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে? তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে। আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনো যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্ব পুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, ততদিন রাজাকার এদেশে কখনো জয়লাভ করতে পারবে না।
এ সময় বিরোধীদলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমান স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার ৩ মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বলেন, আমার বক্তব্যের পরে বলবে, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় মাননীয় বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে ‘ফজা পাগলা’ বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম।
এ সময় অধিবেশন কক্ষের সবাই হেসে ওঠেন। এক পর্যায়ে স্পিকার বলেন, আপনাকে কেউ ‘ফজা পাগলা’ এই ধরনের উক্তি করেছে? এ রকম সংসদে কেউ বলে নাই তো।
সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধীদলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।

